ব্যাখ্যা: “তারা কি উটের প্রতি লক্ষ্য করে না যে, তা কিভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে?”

তারা কি উটের প্রতি লক্ষ্য করে না যে তা কিভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে

ফজরের নামাজ পড়ে কোরআন তিলাওয়াত করছিলাম।সূরা গাশিয়ার ১৭ নং আয়াতে এসে থমকে দাড়ালাম-
“তারা কি উটের প্রতি লক্ষ্য করে না যে, তা কিভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে?”

এতো এতো প্রাণি থাকতে আল্লাহ উটের সৃষ্টির দিকে লক্ষ্য করার কথা কেনো বললেন? কি এমন ব্যতিক্রম আছে এর মাঝে যার কারণে আল্লাহ তাকে বিশেষ ভাবে উল্লেখ করলেন? সাথে সাথে নেটে ঘাটাঘাটি শুরু করে দিলাম।এরপর যা দেখলাম রিতিমতো বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম।কি নিপুণ সৃষ্টি! আল্লাহু আকবার।আপনারাও জেনে নিন মহান আল্লাহর সৃষ্টির সৌন্দর্য। কি বলেন শুরু করা যাক তাহলে-

উট প্রকৃতির এক মহাবিস্ময়, কারণ? এটি ৫৩ ডিগ্রি গরম এবং মাইনাস-১ ডিগ্রি শীতেও টিকে থাকে। মরুভূমির উত্তপ্ত বালুর উপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা পা ফেলে রাখে।কোনো পানি পান না করে মাসের পর মাস চলে। মরুভূমির বড় বড় কাঁটাসহ ক্যাকটাস খেয়ে ফেলে। দেড়শ কেজি ওজন পিঠে নিয়ে শত মাইল হেঁটে পার হয়। উটের মত এত অসাধারণ ডিজাইনের প্রাণী প্রাণীবিজ্ঞানীদের কাছে এক মহাবিস্ময়।এতো কেবল ট্রেইলার,পিকচার আভি বাকি হায়।

চলুন আরো কিছু বিস্ময়কর জিনিস দেখি যা উটকে করেছে অনন্য।

।।এক।।

মানুষসহ বেশিরভাগ স্তন্যপায়ী প্রাণীর দেহের তাপমাত্রা সাধারণত ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের (৯৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট) এর আশেপাশে থাকে। যদি দেহের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা বেড়ে ৩৮.৫ ডিগ্রির (১০২ ফা) বেশি হয়ে যায়, তখন অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলোর ক্ষতি হতে থাকে। ৪০ ডিগ্রির (১০৪ ফা) বেশি হয়ে গেলে লিভার, কিডনি, মস্তিষ্ক, খাদ্যতন্ত্র ব্যাপক ক্ষতি হয়। ৪১ ডিগ্রি (১০৫ ফা) তাপমাত্রায় শরীরের কোষ মরে যেতে শুরু করে।
.
একারণেই যখন স্তন্যপায়ী প্রাণীদের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা স্বাভাবিকের থেকে বেড়ে যায়, তখন শরীর ঘেমে বাড়তি তাপ বের করে দিয়ে ঠাণ্ডা হয়ে যায়।
অথচ উটকে প্রতিদিনই ৪১ ডিগ্রি তাপমাত্রা সহ্য করতে হয়।উট ৪১ ডিগ্রি তাপমাত্রা হওয়ার আগ পর্যন্ত পানি ধরে রাখে এবং এরপর ঘামা শুরু হয়।
.
উট অতি প্রত্যুষে মরুভূমির বালু গরম হওয়ার আগে মাটিতে বসে। বসার সময় পাগুলো শরীরের নিচে বিছিয়ে দেয় যেন মাটি থেকে তাপ শরীরে আসতে না পারে।
সে সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে, যাতে শরীরের ন্যূনতম অংশ উত্তপ্ত হয়।
একপাল উট বিশ্রাম করার সময় পাশাপাশি শুয়ে থাকে, যেন শরীরের অল্প অংশ তাপ গ্রহণ করতে পারে। শরীরের উচ্চ তাপমাত্রাতেও এর metabolic rate স্বাভাবিক থাকে।
.
উটের রক্ত বিশেষভাবে তৈরি প্রচুর পরিমাণে পানি ধরে রাখার জন্য। উট যখন একবার পানি পান করা শুরু করে, তখন এটি প্রায় ১৩০ লিটার পানি, প্রায় তিনটি গাড়ির ফুয়েল ট্যাঙ্কের সমান পানি, ১০ মিনিটের মধ্যে পান করে ফেলতে পারে। এই বিপুল পরিমাণের পানি অন্য কোনো প্রাণী পান করলে রক্তে মাত্রাতিরিক্ত পানি গিয়ে অভিস্রবণ চাপের কারণে রক্তের কোষ ফুলে ফেঁপে ফেটে যেত। কিন্তু উটের রক্তের কোষে এক বিশেষ আবরণ আছে, যা অনেক বেশি চাপ সহ্য করতে পারে। এই বিশেষ রক্তের কারণেই উটের পক্ষে একবারে এত পানি পান করা সম্ভব হয়।
.
।।দুই।।

ড্রোমেডারী উটের একটা কুঁজ থাকে আর ব্যাকট্রীয়ান উটের থাকে দুটো। যখন উট ভালোকরে খেতে পায় তখন এর কুঁজ চর্বিতে ভর্তি হয়ে শক্ত টানটান অবস্থায় থাকে। যখন উট অভুক্ত অবস্থায় অনেকদিন থাকে তখন চর্বির অনেকটাই শক্তি উৎপাদনে ক্ষয় হয়ে যায় আর এর কুঁজ নরম থলথলে হয়ে যায়।[1]
.
।।তিন।।

উটের পায়েও গরুর মত চেরা খুর। কিন্তু উটের পায়ের তলায় নরম প্যাড আছে যা গরুর নেই। গরুর মত উটও রোমন্থন করে বা জাবর কাটে। কিন্তু সাধারণ রোমন্থনকারীদের মতো চার কক্ষ-বিশিষ্ট পাকস্থলির বদলে উটের পাকস্থলি তিন কক্ষ-বিশিষ্ট। তাই অনেকে এদের ছদ্ম রোমন্থক বলেন।[1]
.
।।চার।।

শরীরের ওজনের 30% এরও বেশি সমান পানির হ্রাস সহ্য করতে পারে (ফ্র্যাঙ্কলিন 2011)
অন্যদিকে বেশিরভাগ স্তন্যপায়ী প্রাণীরা 15% হ্রাস পেলেই মারা যায়।[2]
.
।।পাঁচ।।

স্তন্যপায়ীর লোহিত কণিকা গোলাকার। শুধু উটের লোহিত কণিকা ডিম্বাকৃতির, যা পানিশুন্য অবস্থায় রক্ত চলাচলে সহায়তা করে। এর আবরণীও বেশ মজবুত, যা অল্প সময়ে উট অনেক পানি পান করলে যে osmotic variation হয়, তা সহ্য করার ক্ষমতা রাখে ও আবরণী ফেটে যায় না।[2]
.
।।ছয়।।

উট প্রতিরোধ ক্ষমতা অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর চেয়ে পৃথক হয়। গরু এবং ছাগলের তুলনায় উটের রোগ অনেক কম হয়ে থাকে। এর Immune system খুবই ব্যতিক্রমধর্মী। এর Immunoglobulin দিয়ে যে অ্যান্টিবডি তৈরি হয় তাতে লাইট চেইন থাকে না।
সাধারণত, ওয়াই-আকৃতির অ্যান্টিবডি অণুগুলিতে Y এর দৈর্ঘ্যের সাথে দুটি ভারী(Heavy) (বা দীর্ঘ) চেইন থাকে এবং Y এর প্রতিটি ডগায় দুটি হালকা (বা সংক্ষিপ্ত) চেইন থাকে, এগুলি ছাড়াও অ্যান্টিবডিগুলিও থাকে মাত্র দুটি ভারী চেইনের একটি বৈশিষ্ট্য যা তাদেরকে আরও ছোট এবং আরও টেকসই করে তোলে। 1993 সালে আবিষ্কৃত এই “Heavy-chain-only” অ্যান্টিবডিগুলি ৫০ মিলিয়ন বছর পূর্বে বিকশিত হয়েছিল বলে মনে করা হয়।[3]

এতো নিপুণ সৃষ্টিতো তার পক্ষেই সম্ভব যিনি এ বিশ্বজাহানেরও স্রষ্টা।তার সৃষ্টির দিকে থাকালে অজান্তেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে ‘সুবহানআল্লাহ’।

#কুরআনেরছায়তলে

উট
মোঃ শাহরিয়ার নাফিস

রেফারেন্স:
[1]Wikipedia.
.
[2] “Bactrian & Dromedary Camels”. Factsheets. San Diego Zoo Global Library. March 2009
.
[3]Koenig, R. (2007). “VETERINARY MEDICINE: ‘Camelized’ Antibodies Make Waves”. Science. 318 (5855): 1373.

ক্রেডিট: মিম্বার(Mimbar)

Leave a Reply

Your email address will not be published.