জিগুরাত মুখোশ বই রিভিউ

মুখোশ বই রিভিউ
বইঃ জিগুরাতঃ মুখোশ পর্ব
পৃষ্ঠাঃ ৩৫২
মুদ্রিত মূল্যঃ ৩৮০ টাকা

ঢাকা আর্ন্তজাতিক বিমান বন্দরের রানওয়েতে টাইগার এয়ারওয়েজ ফ্লাইটটির ঘর্ষণের ফলে বাতাসে যখন শাঁ-শাঁ আওয়াজের সৃষ্টি হচ্ছিলো, রাতের আকাশে ভরাট চাঁদ তখন জায়গা করে নিয়েছিলো। তারার আলোয় পূর্ণতা পাওয়া ঐ সময়টা কিছু মানুষের জন্য আনন্দের, কিছু মানুষের জন্য কাব্যের, কিছু মানুষের জন্য অবারিত রস পানের!

আবার একইসাথে, কিছু মানুষের জন্য তা ছিলো দুর্যোগের ঘনঘটার মতো, যা বন্যার জলে ভেসে যাওয়া অস্তিত্বহীন সত্তার রূপে নিজেকে মেলে ধরছিলো।
রানওয়ে বিমান থামার মিনিট দুয়েকের মধ্যে-ই, সিটের উপরে তাকের মতো থাকা ওভারহেড বিন–এর ভিতর থেকে নিজের ড্যাফল ব্যাগটি হ্যাঁচকা টানে বের করে নিলো গোছানো চুলের গম্ভীর চেহারার যুবকটি, পরিচ্ছন্ন পোষাক পরিহিত ছেলেটির চোখ দু’টো আড়াল হয়ে আছে রোদ-চশমার পিছনে।
দুপুরের কড়া রোদ থেকে চোখের নিরাপত্তার জন্য রোদ চশমা পড়া হলেও পরিপাটি এই যুবকের জন্য যে এই সূত্রটি খাটে না, তা সহজেই অনুমানযোগ্য। চোখের চশমাটিকে উপরে-নিচে দু’বার নাড়িয়ে ব্যস্ত পায়ে যাত্রীদের খানিকটা ঠেলে, পাশ কাটিয়ে, বেরিয়ে যেতে লাগলো বিমান থেকে।
যেনো এটা যানবাহনটা একটা লোকাল বাস!
বিমানে থাকা অন্যান্য যাত্রীদের যে অসুবিধা হতে পারে, এই ব্যাপারে তার চেহারায় বিন্দুমাত্র কোনো উদ্বেগ ছিলো না।
বিমান থেকে নেমে বিমান-বন্দরের ভিতরে পৌঁছে কাগজপত্রের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে আবারও ব্যস্ত পায়ে বেরিয়ে এসে দেশের মাটি স্পর্শ করলো যুবকটি, চারপাশে চোখ ঘুরিয়ে কাউকে খুঁজতে মনোযোগী হয়ে গেলো সে।
প্রায় বছর পনেরো পর, দেশের মাটিতে এভাবে আচমকা-ই পা রাখতে হবে, তা কখনো দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি সে!
রাত হোক কিংবা দিন হোক, বাংলাদেশের প্রধান ও অন্যতম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে, আত্নীয়স্বজন ও পরিচিতদের মিলনমেলা ও বিদায়-বিচ্ছেদের ভিড় সবসময় লেগেই থাকে। আর, এই ভিড়ের মধ্যে, খানিকটা দূরে, লাল রঙের প্লে-কার্ডের মধ্যে নিজের নাম দেখে যুবক ছেলেটি এগিয়ে গেলো সেদিকে, প্লে-কার্ড ধরে রাখা কাঁচাপাঁকা চুলের লোকটির দিকে তাকালো সে।
প্লে-কার্ডে যে তার নাম-ই লেখা আছে, সেটি সদ্য বিদেশ-ফেরত ছেলেটি ইশারায় বুঝিয়ে দিলো লোকটিকে। ইশারা বুঝতে পেরে প্লে-কার্ড‘টি নিচু করলো সে, অন্যহাতে থাকা মোবাইলটির স্ক্রিনে ভাসমান ছবির দিকে একবার ও সামনে দাঁড়ানো যুবকটির দিকে আরেকবার তাকিয়ে… ছবির সাথে মিলিয়ে নিতে লাগলো লোকটি।
ছবির সাথে চেহারার মিল পেয়ে সন্তুষ্টির হাসি হাসলো সে।
লোকটির হাসি দেখে রোদ চশমা চোখ নিয়ে, নির্বিকার দৃষ্টিতে লোকটির দিকে তাকিয়ে থাকলো যুবক ছেলেটি। নিজের অযাচিত হাসিই যে একদিন তার চাকরি খাবে, তা বুঝতে পেরে বেলুনের মতো চুপসে গিয়ে লোকটি।
ড্যাফল ব্যাগ আর স্যুটকেস গাড়িতে উঠানোর আগেই গাড়ির দরজা খুলে দিলে নিঃশব্দে গাড়ির ভিতরে বসে গেলো পরিপাটি-পরিচ্ছন্ন পোষাকের ছেলেটি। ব্যাগগুলো গাড়ির পিছনের অংশে রেখে চালকের আসনে বসলো কাঁচা-পাঁকা চুলের লোকটি। সিট-ব্যাল্ট পড়ে নিয়ে লাল রঙের চমকপ্রদ গাড়িটি যাত্রা শুরু করলো নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে।
রাতের পুরো আকাশ যখন আড়মোড় দিয়ে জাগ্রত হওয়ার অপেক্ষায় ছিলো, তার ঠিক কিছুক্ষণ আগে, লাল রঙের গাড়িটি নির্দিষ্ট গন্তব্যে এসে থামলো। প্রকৃতির পুরো আবহ তখন নতুনভাবে জিইয়ে উঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো।
“ভাইজান!” খানিকটা দৃঢ় কন্ঠে পিছনের প্যাসেঞ্জার-সীটে ঘুমন্ত যুবককে উদ্দেশ্য করে বললো লোকটি, আচমকা ডাক শুনে ঘন্টা দুয়েকের ঘুম ভেঙে গেলো ছেলেটির। “চলে এসেছি আমরা।”
চালকের আসনে বসা লোকটির কথা শুনে গাড়ি থেকে বেরিয়ে চোখের রোদ-চশমা প্রথমবারের মতো খুললো সে, বেদনা-বিষাদের রুক্ষতা পুরোপুরিভাবে ছেয়ে গিয়েছিলো তার দু’চোখে।
মাথা উঁচু করে সামনে থাকা বহুতল ভবনের দিকে তাকানো মাত্রই গভীর এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার বুক চিঁড়ে, ছলছল করে মুহূর্তের মাঝে পূর্ণ হয়ে উঠলো চোখজোড়া।
বহুতল ভবনটির একদম উপরে, সাইনবোর্ড আকৃতির মতো, রঙিন আলোয় জ্বলতে থাকা বারোমাসি হসপিটাল নামটিতে চোখ পড়ার পর অজানা এক অভিকষর্জ ত্বরণ তাকে মাটির দিকে টেনে ধরতে লাগলো, এমন ছন্নছাড়া অনুভূতি হতে লাগলো তার!
যদিও, সবকিছুকে ছিন্নভিন্ন করে, আবেগকে দমিয়ে নিয়ে, কর্তব্য পালনের জন্য নির্ভীক চিত্তে, হাসপাতালের ভিতরে ঢুকে গেলো সে। চালকের আসনে থাকা আধ-পাঁকা চুলের লোকটি এগিয়ে থেকে পথ দেখিয়ে দিচ্ছিলো তাকে, সিঁড়ি বেয়ে তিন তলার আই.সি.ইউ.–এর সামনে আসার পরমুহূর্তে বরফের মতো জমে গেলো সে।
যেনো নিষিদ্ধ নগরীর অবস্থান এই সিঁড়ির উপরে!
তৃতীয় তলা থেকেই হাসপাতালের চিকিৎসা-সংক্রান্ত কাজগুলো পরিচালিত হয় বিধায় সেখানে সর্বত্র ভেসে বেড়াচ্ছিলো উটঁকো মেডিসিন–এর কটু গন্ধ, যা যুবকটিকে অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছিলো। একইসাথে, হাসপাতালের পুরো পরিবেশের পিনপিন নীরবতা আর দুশ্চিন্তাময় নিস্তবদ্ধতার করুণ আবহের ফলে হুট করেই তখন, মাথা ঘুরে পড়ে যেতে লাগলো সে।
“ভাইয়া!” কাতর কণ্ঠে সিঁড়ির কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা হ্যাংলা-পাতলা গড়নের ছেলেটি জাপটে ধরে ফেললো তাকে, ঠেস দিয়ে সামলে নিয়ে যুবক ছেলেটিকে বসিয়ে দিলো করিডোরে থাকা চেয়ারগুলোতে।
“তুমিও যদি এভাবে ভেঙে পড়ো, তাহলে তো সবকিছুই শেষ হয়ে যাবে। নিজেকে প্লিজ শক্ত রাখো।”
কথাগুলো বলে হ্যাংলা-পাতলা গড়নের যুবকটি চোখের পানি ঝরঝরিয়ে ফেলে দিলো, নিজের

ভেতরের কষ্টগুলোকে সামলাতে না পেরে সদ্য বিদেশ-ফেরত পরিপাটি পোষাকের যুবকটিকে বলতে লাগলো সে।

মেঝেতে বসে মাথা নিচু করে, হাঁটু ভেঙে পায়ের উপর ভর দিয়ে, গোঙানির সুরে কাঁদতে থাকলো হ্যাংলা-পাতলা ছেলেটি।
“আহ, ইমন!” কান্নার আওয়াজ তীরের মতো এসে বিঁধে যাচ্ছিলো তার হৃৎপিন্ডে, মস্তিষ্কে, সেগুলো সে সহ্য করতে না পেরে শেষমেষ ক্লান্ত হয়ে বলে উঠলো। “কান্না বন্ধ কর, উনি তো এখনও মারা যায়নি। বেঁচে তো আছেন, নাকি?”
স্বজনের বেদনা দেখে আর্তনাদের কান্নায় ভেসে যাওয়া চোখগুলোর জলস্রোতকে বাঁধ হিসেবে আঁটকে রাখলো যুবক ছেলেটি, প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজের ব্যক্তিত্বের ছাপ ফেলে যাচ্ছিলো সে।
“মাজহার, ভাতিজারে!”
আই.সি.ইউ. রুমের সামনে, পাঞ্জাবি পড়া স্থূলকার শারীরিক গড়নের লোকটি সম্পর্কের নামে ডেকে উঠলো যুবকটিকে, বিগত পনেরো বছরের আলোকবর্ষ দূরত্ব এক মুহূর্তে-ই ঘুচিয়ে দিলো সিদ্দীকি জমশেদ নামের লোকটি।
পনেরো বছর আগে, নূর জমশেদ ও তার স্ত্রী শীলা আফরোজের বিবাহ বিচ্ছেদ হওয়ার পর একমাত্র ছেলেকে নিয়ে সিঙ্গাপুর স্থানান্তরিত হয়ে গিয়েছিলো শীলা আফরোজ। বিচ্ছেদের ঘটনার পর, বিগত পনেরো বছরে, একদিনের জন্যেও নূর জমশেদের সাথে কোনো প্রকারের সামাজিক যোগাযোগও করেনি।
বিবাহ বিচ্ছেদের পর, শীলা আফরোজের একমাত্র দেবর সিদ্দীকি জমশেদ তাদের টুকটাক খোঁজ-খবরের চেষ্টা করলেও নূর জমশেদের অযাচিত চেঁচামেঁচি আর বিরূপ ব্যবহারের জন্য সেই সুতোটাও ছিঁড়ে গিয়েছিলো!
আর এভাবেই, সম্পর্কের টানাপোড়নে এক সুতোর মালায় বাঁধা থাকা চরিত্রগুলো নিজেদের মতো করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গিয়েছিলো।
কিন্তু গত পরশু, দেশের আবাসন-প্রকল্পের অন্যতম উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান, জমশেদ হাউজিং গ্রুপ, দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার ঘটনায় স্ট্রোক করে বসে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও কর্ণধার নূর জমশেদ। আচমকা এই স্ট্রোকের কারনে, বর্তমানে পক্ষাঘাতগ্রস্থ তথা প্যারালাইসড অবস্থায় চিকিৎসাধীন আছে এই হাসপাতালে।
নূর জমশেদের সাথে ঘটে যাওয়া দূর্ঘটনা ও তার এহেন শারীরিক অবস্থার খবর পাওয়ার পরপর-ই, নিজেদের মধ্যে থাকা সমস্ত রাগ-ঘৃণা-অভিমান’কে দূরে রেখে মানবিকতা ও সম্পর্কের সূত্র ধরে, প্রাক্তন স্বামীকে দেখতে আসতে চেয়েছিলো শীলা আফরোজ।
কিন্তু ভিসা জটিলতার কারণে বাংলাদেশে আসতে পারেনি সে।
ফলশ্রুতিতে, নূর জমশেদ ও শীলা আফরোজের একমাত্র ছেলে মাজহারকে বাংলাদেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে, জমশেদ পরিবারের সমস্ত সদস্যদের ছবি দেখিয়ে কার সাথে কী সম্পর্ক, তা জানিয়ে দিয়েছিলো শীলা আফরোজ।
সিঙ্গাপুরের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস চারেক আগে, মাজহারের খন্ডকালীন শিক্ষকতার চাকরি হওয়ার দরুণ খুব সহজেই ভিসার ব্যবস্থা হয়ে গিয়েছিলো তার।
অন্যদিকে, সিদ্দীকি জমশেদ সর্বশেষ যখন তার একমাত্র ভাতিজার চেহারা দেখেছিলো, তখন তার বয়স ছিলো সাত কিংবা আট! এতোবছর পরে নিজের টগবগে যুবক ভাতিজাকে দেখে কীভাবে চিনবে, তা মুখে উচ্চারণ করে না বললেও বিষয়টি ঠিকই বুঝে নিয়েছিলো শীলা আফরোজ।
মাজহারকে চিনতে যাতে কোনো অসুবিধা না হয়, সেজন্য তার ছবি হোয়াটস-অ্যাপে পাঠিয়ে দিয়েছিলো মিসেস আফরোজ। ছবি পাওয়ার পর সিদ্দীকি জমশেদ, কাঁচাপাকা চুলের লোকটিকে, মাজহারের নাম ও ছবি দিয়ে বিমানবন্দরে পাঠিয়ে দিয়েছিলো, সেখান থেকে মাজহারকে গাড়িতে করে পৈতৃক জেলা মাধবপুরে নিয়ে এসেছিলো।
“চাচ্চু!”
সিদ্দীকি জমশেদের ডাকে সাড়া দিয়ে, চেয়ার ছেড়ে আই.সি.ইউ. রুমের দিকে এগিয়ে গেলো মাজহার, দরজাতে বৃত্তের মতো সাদা কাঁচের স্কোপ দিয়ে ভিতরে শুয়ে থাকা লোকটি’কে পনেরো বছর পর সামনাসামনি দেখার, স্পর্শ না করতে পারার কষ্টে, চোখগুলো বন্ধ করে ফেললো সে।
পরমুহূর্তে, টপ-টপ করে কান্নার ফোঁটা, স্রোত হয়ে বয়ে গেলো দু’চোখ দিয়ে।
“উনি কি একদম প্যারালাইসড? ক..ক্কথা কি একদম-ই বলতে পারেন না? হাত-পা… কো…ক্কোনোটাই নাড়াতে পারেন না?”
কথাগুলো কণ্ঠনালী দিয়ে বের হতে গিয়ে বেশ কয়েকবার আঁটকে যাচ্ছিলো তার, মস্তিষ্কের সেরেব্রাল কর্টেক্সের অনুভূতিগুলো কলিজায় তেরো ইঞ্চির বিষাক্ত ছুরির মতো ঢুকে গিয়ে মোচড় দিয়ে কার্যত রূপ নিতে লাগলো।
সিদ্দীকি জমশেদকে করা প্রশ্নগুলোর উত্তর জানার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে নিলো সে।
“না, কিচ্ছু না। ভাইজান পুরোপুরিভাবে প্যা..প্যারা..ল্লাইসড, একদ্দ..ম-ই…”
ঘটনার সত্যতা জেনেও তা উচ্চারণ করতে গিয়ে বার-কয়েক থামলো সিদ্দীকি জমশেদ, চোখ আর চেহারার হাবভাব’কে পুরোপুরিভাবে সামলে নিয়ে তটস্থ হয়ে ছিলো। সেই সাথে, নিজের ভাইয়ের শোকাতুর অবস্থার প্রভাব যেনো নিজের ভাতিজা মাজহারকে স্পর্শ করতে না পারে, সেজন্য নিজেকে শক্তিশালী দেয়ালের রূপও দিয়েছিলো।
“যদিও ডাক্তাররা এখন পর্যন্ত কিছু বলছে না, কিন্তু ভাইজানের শারীরিক অবস্থার বিন্দুমাত্র কোনো উন্নতি নেই। নিরথ লাশের ম…”
পরবর্তী শব্দগুলো কী হতে পারে, তা খেয়ালে আসতে-ই চুপসে গেলো সিদ্দীকি জমশেদ, নিজের চাচার দিকে হাজারো প্রশ্ন নিয়ে পুরো ঘটনা জানার এক কৌতূহল তখন ঘিরে ফেলেছিলো মাজহারকে।
“কিভাবে হলো এতো কিছু? এতোগুলো ঘটনাটা একসাথে ঘটলো কিভাবে? উনি আচমকা কিভাবে প্যারালাইজড হয়ে গেলেন?”
একের পর এক প্রশ্নের বাণ ছুঁড়ে দিয়ে নির্বাক দৃষ্টিতে উত্তরের অপেক্ষায় তাকিয়ে ছিলো সদ্য বিদেশ ফেরত যুবকটি, সিদ্দীকি জমশেদের ভাতিজা মাজহার।
পুরো ঘটনাপর্ব বিস্তারিতভাবে বলতে চাওয়ার পূর্ব-মুহূর্তে, হাসপাতালের কর্তব্যরত ও জমশেদ পরিবারের ব্যক্তিগত চিকিৎসক, নিবিড় পরিচর্যা ইউনিট তথা আই.সি.ইউ থেকে বেরিয়ে এলো।
সিদ্দীকি জমশেদ মাজহারের সাথে নূর জমশেদের বর্তমান শারীরিক অবস্থা, অসুস্থতা এবং পক্ষঘাতগ্রস্ততার ব্যাপারে পূর্ণাঙ্গ তথ্য জানিয়ে শেষমেষ “আল্লাহর কাছে দো’আ করতে থাকুন” বলে সিঁড়ি বয়ে নিচে নেমে গেলো হাসপাতালের কর্তব্যরত ডাক্তার।
শেষোক্ত “আল্লাহর কাছে দো’আ করতে থাকুন” কথাটা শোনার পর, বড় এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো মাজহারের বুক চিঁড়ে। সিক্ত পত্রপল্লবকে সবার চোখের আড়াল করার জন্য চাচাতো ভাই ইমন জমশেদ’কে সাথে নিয়ে নিঃশব্দে হাসপাতালের বাইরে বেরিয়ে এলো সে।
ঘটনাটির দিকে নজর গেলে আই.সি.ইউ.’র বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সদস্যদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে মাজহারের পেছন পেছন বাইরে বেরিয়ে এলো সিদ্দীকি জমশেদ!
“চাচ্চু, সিগারেট আছে?”
হুট করে এহেন প্রশ্ন শুনে মাজহারের দিকে বিহ্বল হয়ে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকলো সিদ্দীকি জমশেদ, তার চোখের টলমল করতে থাকা পানি যেনো সবকিছু ধুয়ে দিলো এই মুহূর্তে।
পরমুহূর্তেই, দূরে থাকা মসজিদ থেকে দিনের প্রথম আযানের ধ্বনি সমস্ত কিছুতেই রবের স্বীকার্যতা ঘোষণা করে ভেসে আসতে লাগলো।
মুয়াজ্জিনের আযানের পর, কোনো প্রকার বাড়তি আওয়াজ কিংবা ভণিতা না করে, নিজের পাঞ্জাবির পকেটে থাকা সিগারেট প্যাকেট মাজহারের দিকে এগিয়ে দিলো সিদ্দীকি জমশেদ। শুষ্ক ঠোঁটে সিগারেট স্পর্শ করে সেটিকে জীবন্ত করে টানা দশ ঘন্টা তৃষ্ণার্ত থাকা ফুসফুসের পিপাসা মেটালো মাজহার।
ফুঁক-ফুঁক করে ফুসফুসের ধোঁয়া উড়ে মিশে যাচ্ছে বাতাসে, সমস্ত প্রলাপন যেনো লেখা হচ্ছে আকাশে।
“আমাদের কোটি টাকার ব্যবসা এভাবে হুট করেই দেউলিয়া হয়ে গেলো কিভাবে? কার মদদে হলো এতো কিছু? আমাদের পায়ের নিচের মাটি এভাবে কে সরিয়ে দিলো, চাচ্চু?”
কথাগুলো বলতে বলতে মাজহারের চোখের সাদা অংশ লাল হতে শুরু করলো, ভিতরে বাড়তে থাকা চাপা আর্তনাদ আর প্রতিহিংসা বেড়িয়ে আসছিলো ধীরে ধীরে।
“যে আমার আপনজনকে কেড়ে নিয়েছে, আমি তাকে নরকের স্বাদ ভোগ করাতে চাই। প্রয়োজন হলে নিজেকে আত্নহুতি দিয়ে প্রতিশোধের স্বাদ নিবো!”
আগ্নেয়গিরির ফুটন্ত লাভার মতো করে মাজহারের চোখ-ঠোঁট-মুখ-দেহভঙ্গি দিয়ে প্রতিশোধের চক্রাবৃত্তের খেলা চলতে লাগছিলো, আর তা দেখে নিজেদের সাম্রাজ্য হন্তাকরকারীর পরিচয় উন্মোচন করলো সিদ্দীকি জমশেদ।
“যা কিছু ঘটেছে, যা কিছু হয়েছে… সবকিছুতে জেলার বর্তমান এম.পি.’র হাত আছে। নিজের রাজনীতির জন্য মিঁঞা ভাইকে বলির পাঁঠা বানিয়ে আমাদের সমস্তকিছু ধ্বংস করে দিয়েছে,” সাপের মতো ফোঁস-ফোঁস করতে করতে নিজের ভিতরের জিঘাংসাগুলোকে একে একে প্রকাশ করতে লাগলো সিদ্দীকি জমশেদ।
সন্তপর্ণে সে এগিয়ে যেতে থাকলো প্রতিহিংসা, প্রতিশোধ আর জিঘাংসার দিকে।
“মিঞা ভাইয়ের এই অবস্থার জন্য এম.পি.’কে মাশুল দিতে হবে। যদি তুই এর প্রতিশোধ নিতে চাস, তাহলে আমি এই ব্যাপারে তোকে সহযোগিতা করবো। আর যদি পিঠ দেখিয়ে, আমাদের ছেড়ে চলে যাস বিদেশে, তবে সেটাও মুখ বুজে মেনে নিবো। বাকি সবকিছু এখন তোর উপর!”
ভিতরে জমে থাকা কথাগুলো একনাগাড়ে বলে শেষ করলো সিদ্দীকি জমশেদ, যদিও মাজহার আফরোজ জমশেদের চোখগুলো তখন ভোর সকালের স্নিগ্ধ আকাশপানের দিকে দৃষ্টিবদ্ধ ছিলো।
বড় একটা দম নিয়ে সিগারেটের ফিল্টার টেনে একরাশ ধোঁয়া আকাশের বুকে ছেড়ে দিয়ে সিদ্দীকি জমশেদের দিকে তাকালো মাজহার, পাশে নিরব দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে থাকা চাচাতো ভাই ইমন একদৃষ্টিতে ঘটনাগুলোর সাক্ষী হয়ে থাকলো।
“আমরা যদি প্রতিশোধ-প্রতিহিংসার খেলা খেলতে চাই, তাহলে আমাদের গোঁয়ারের মতো মোটা-বুদ্ধি নিয়ে খেললে চলবে না। অনেকটা লম্বা সময়ের জন্য খেলতে হবে এই খেলা!”
সদ্য বিদেশ ফেরত ছেলের কথাগুলো গোগ্রাসে গিলতে লাগলো সিদ্দীকি জমশেদ, পুরো ঘটনাতে মাজহার তখন পীরের ভূমিকায় আবর্তিত হয়েছে। ক্ষণিক সময় ভেবে নিয়ে মাজহারের পরিকল্পনাতে মাথা নাড়িয়ে রাজি হলো সে, দাঁড়ানোর দেহভঙ্গি বদলে নিয়ে নিজেও একটা সিগারেটকে জীবন্ত করে তুললো।
“কী খেলা খেলতে চাচ্ছিস, তুই? যাই পরিকল্পনা করিস না কেনো, এটা মনে রাখিস, সে কিন্তু জেলার একজন এম.পি.। সামনের নির্বাচনে জিততে পারলে নিশ্চিত মন্ত্রী হয়ে যাবে সে।”
সিদ্দীকি জমশেদের প্রত্যেক কথাতেই মাথা নেড়ে সম্মতি দিয়ে গেলো মাজহার, এরপর খানিকটা সময় নিয়ে এক-এক করে নিজের পরিকল্পনাগুলো বলতে লাগলো সে। কথাগুলো বলতে বলতে আবারো নতুন একটা সিগারেটকে জীবন্ত করে তার ফিল্টারে চুম্বন দিতে লাগলো।
নিজের পরিকল্পনার রাজ্যে ধীরে ধীরে ডুব দিতে লাগলো মাজহার নামের যুবকটি। জিঘাংসা, প্রতিহিংসা আর প্রতিশোধের এক নতুন অধ্যায় রচিত করতে লাগলো সে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.